‘হঠাৎ এমন দামী তৈলচিত্র কিনতে গেলে যে! এটা কি আসল? মানে কোন আর্টিস্টের আঁকা, ওরিজিনাল? মানে ছবির ছবি নয়, তাই না?’
বাইরে হু হু বাতাস আর বরফঝড়, সাথে ফ্রিজিং রেইন। মনামি সেসবের কিছু দেখছে না। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শুনছে। ফোনকলের অপর প্রান্তে এরন। মনামির বন্ধু কাম ফিনান্সিয়াল অ্যাডভাইজর কাম অ্যাকাউন্টেন্ট।
সামনে ট্যাক্স ফাইলিংয়ের সিজন, হিসাব নিকাশের আলাপের জন্য সম্ভবত এই আর্জেন্ট কল। তাই ভেবে এরন কলটা ধরেছে। কাছের বন্ধু বলে কথা। এখন বুঝতে পারছে না, ঠিক বিষয়টা কী। ছবির খবর শুনে জিজ্ঞেস করে, ‘বাজারে আগুন। সারাক্ষণ বলছ, তোমার বাজেট আর সেভিংসের প্ল্যান ঠিক ঠাক করে দিতে। কীভাবে সেইভ করবা দুইটা ডলার, তার হিসেব করে আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছ, আর হঠাৎ এত দাম দিয়ে একটা ছবি, খুব স্পেশাল কিছু?’
মনামি হেসে বলে, ‘না… মানে বাড়ি কিনতে গিয়েছিলাম তোৃ তাই, ছবি কিনেছি।’
হতভম্ভ ধরনের শোনায় এরনের গলা। ‘সরি, আই এম লস্ট। তুমি বাড়ি কিনতে চাও, একথা তো আগে শুনিনি। আমি তো জানি তোমার মাথা গোঁজার ঠাই আছে।’
শোন আমার দেশের একটা প্রবচন শোনাই : গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন, হলে প্রয়োজন।
কথাটা অনুবাদ করে শোনানোর পরও এরনের মাথায় কিছু ঢুকল বলে মনে হলো না।
মনামি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে, ‘বাসা যে একটা আছে সে তো অন্য শহরে, ভাড়ায় আছে। মর্টগেজের ইন্টারেস্ট যে হারে বাড়াচ্ছ তোমরা, তাতে ওখানে আমি সমানে মাসকাবারি লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। বিক্রিও করতে পারছি না। তোমার বড় শহরে বাড়িঘরের বিক্রির বাজারে ধস। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা নেই। লসে বিক্রির বিলাসিতা করার ক্ষমতা ও আমার নেই। রিয়েল এস্টেট- এর হাইপের সময়ে তোমার বুদ্ধিতেই তো কেনা। আর এখানে কিনা একটা বেজমেন্ট এ হেদিয়ে মরছি”।
এরনের শহরে আজ ঝকঝকে রোদ। জানুয়ারির কঠিন শীতেও তাপমাত্রা প্লাস এ উঠে গেছে। গ্লোবাল ওয়ারমিংয়ের ফল নির্ঘাত। ফ্যামিলি নিয়ে লেইক আর পার্কে এ যাবার জন্য মন উচাটন। একটা লম্বা ড্রাইভের জন্য নতুন কেনা টেসলা গাড়িটা ডাকছে। মনামি কাজের সুত্রে দূরের এই ছোট শহরে এখন। একসময়ে মেলা উপকার করেছে সে এরনের। মনামি না থাকলে মস্ত এ শহরে আকালের বাজারে তার একটা নিজস্ব বাড়ির ঠিকানা থাকত কিনা কে জানে! দু’জনেই এদেশে ইমিগ্র্যান্ট। ক্রুসিয়াল একটা সময়ে তাদের দেখা। একজন আরেকজন কে সাহায্য করে তারা আজ এতদূর এসেছে।
সময়ের বাউন্ডারি ভুলে কৌতূহলের ধন্ধে পড়ে এরন। রহস্যময় দার্শনিক ধাঁচের ভিনদেশি এই বন্ধুকে সে কখনোই এড়াতে পারে না।
এরন জিজ্ঞেস করে, ‘বাহ, বাড়ি কেনার আগে দেয়ালের জন্য ছবি কেনা সারা! তো ছবির দাম পড়ল কত শুনি? হাজার খানেক ডলার তো হবে নাকি? আর আমি তো জানতাম, বেজমেন্টের যে ভাড়া বাসায় আছো, সেখানে বেশ আছো। এনিওয়ে, অভিনন্দন! বাড়ি যে কিনবে তার জন্য মর্টগেজের লোকের সাথে কথা বলেছ নিশ্চয়ই। এখন বলো ক্লোজিং কবে? তোমার ট্যাক্স আর অন্যান্য লায়াবিলিটিজ-এর হিসাবটা কুইক করে ফেলিৃ আমার আবার একটু বেরোতে হবে কিনা।’
‘আহ, এক দমে এত প্রশ্ন! আমার কি মাথা খারাপ! ডাউন পেমেন্ট আর মর্টগেজের হিসেব ু দুটো দুদিকে ছুটলে হিসেব মেলাই কীভাবে!’ মনামি হা হা করে হাসছেঃ ‘আসলে কী জানো, বাড়ি কিনতে চেয়েছিলাম একটা বড় জানালার জন্য।’
‘ওহ, শুধু একটা বড় জানালার জন্য বাড়ি কিনতে চায় কেউ, কোনদিন শুনিনি।’
‘তুষারের ঝড় দেখব, স্নো ফ্লেক্স- এর উড়ানি দেখব, বাতাস আর গাছের দুলুনি দেখব, রোদ আর ছায়ার লুকোচুরি দেখব, বৃষ্টির ধোঁয়া দেখব। সেজন্য একটা বড় জানালার খুব দরকার ছিল। তাই ছোট খাটো হলেও একটা বাড়ির খোঁজ করেছিলাম, যার একটা বড় জানালা আছে। জানো তো গ্রাম গ্রাম স্বভাবের এশহরে অ্যাপার্টমেন্ট অপশন নেই। তো বাড়ি দেখেও ছিলাম একটা। রিয়েল এস্টেট এজেন্টের কথায় কোন কুক্ষণে যে গেছিলাম দেখতে? আগেই জানতাম হিসেব মেলানো কঠিন হবে। তবু গেছিলাম। রিয়েল এস্টেটের মেয়েটা কী মিষ্টি করেই না বলল, ‘এখনই কিনতে হবে এমন তো কথা নেই। দেখতে থাকো’। প্ররোচনায় পড়ে গেলাম। একতলা ছিমছাম বাংলো বাড়িটা পছন্দ না হবার কোন কারণ নেই। সবদিকে বড় বড় কাচের জানালা। আরামদায়ক হ্যামকসহ পেছনের ছোট্ট ইয়ার্ড এমন করে সাজানো যে বরফ পরিষ্কারের হাঙ্গামা না করেও থাকা যায়। কী পরিমাণে এই এজেন্টরা মনের খবর রাখে, বুঝো। ঘরে ফিরে থেকে সমানে হিসেব করেছি। ক্যালকুলেটর ভেঙে ফেলার যোগাড়। উঠে পড়ে হিসেব করে দেখি,- মেলে না, হিসেব মেলে না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল মনামির প্রান্ত থেকে।
এরনের মাথার চুল ছেঁড়ার যোগাড়। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এখনো বুঝলাম না ু জানালা, বাড়ি, হিসাব নিকাশ এসবের সাথে অয়েল পেইন্টের এই নতুন ছবির সম্পর্কটা কী!’
বড় একটা নিঃশ্বাসের শব্দের সঙ্গে মনামির নিরুত্তাপ গলা শোনা যায়, ‘হু উ ম… জানালার জন্যই তো বাড়ি কিনতে চেয়েছিলাম। জানালা দিয়ে বরফ, বৃষ্টি, জল, রোদের খেলা দেখব। হ্রদে যাওয়ার পথটা চোখের সামনে থাকবে। হ্রদের চূড়া থেকে বিচটা হয়তো দেখা যাবে না। হবে না, মেনে নিয়েছি। অনেক হিসাব করে দেখলাম, বাজেটে টান পড়লেও একটা সৌখিন ছবি কিনতে পারি। এমন ছবি, যাতে বড় জানালা দিয়ে অনতিদূরের হ্রদের কিনারা দেখা যায়। উপকূলে আছড়ে পড়া ঢেউয়ে সকালের সোনারোদ ঝিকমিক করে। আর অলৌকিক ঈশ্বরের জাদুতে জলের নিচের রোদের ছায়াও যেন রোদ পোহায়!’

