অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণে গর্ব করার মতো একটা দিন ছিল আমাদের। আমার একমাত্র খালাতো ভাই প্রকৌশলী শরীফ হৃদয় নিয়ে গিয়েছিল তার প্রজেক্ট `ম্যাডলো বাথ স্টেশন আপগ্রেড এন্ড পেডাস্ট্রিয়ান ফুটব্রিজ’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে। গতবছর ব্লু মাউন্টিনস যাওয়ার সময় জানতাম কাটুম্বাতে হৃদয় আসে তার প্রজেক্টের কাজে। তবে আমিও যে এবছর এসে একটা চমৎকার ও ভিন্ন রকম এক অভিজ্ঞতার অংশ হবো, তা ভাবতে পারিনি।
সকালবেলা আমি, জাহিদ, আন্টি, হৃদয় ও জাভিয়ান রওয়ানা দিলাম ম্যাডলো বাথের উদ্দেশে। নায়নার অফিসে জরুরি কাজ আছে, আজ যেতে পারছে না। বাসা থেকে প্রায় দেড় ঘন্টার ড্রাইভ। চলতি পথে আগাথার ফোন এসেছে। ফোনটা লাউড স্পিকারে দেয়া। হৃদয় যখন তাকে বলল, ‘মাই ফ্যামিলি ইজ উইথ মি।’ আগাথা খুব আন্তরিক গলায় বলল, ‘হাই ফ্যামিলি’ এক বছরের জাভি বাবু তখন আমার সাথে তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলে যাচ্ছে। জাভির কণ্ঠ শুনে এবার আগাথা বলে উঠল, ‘হাই জাভি।’ ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ চমকপ্রদ লাগল। ভদ্রতা ও বিনয় পশ্চিমাদের কাছ থেকে আমাদের শেখা উচিত।
গাড়িটা আরেনকো কনস্ট্রাকশন অফিসের ম্যাডলো বাথ সাইটে আসতেই আগাথা ছুটে এল আমাদের কাছে। ভীষণ হাসিখুশি ছিপছিপে অবয়বের মধ্যবয়সী পোলিশ বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান নারী। দেখে মনে হলো বহু বছর ধরেই যেন আমরা একে অপরের পরিচিত। হাতে কিছুটা সময় আছে অনুষ্ঠান শুরু হতে, তাই সবাই চলে গেলাম পটব্যালো ক্যাফেতে। সবার কফির তৃষ্ণা পেয়েছে, ওদিকে জাভিকেও কিছু খাইয়ে নিতে হবে। মাকে ছাড়া বাবুটা আমাদের সাথে এসেছে, তাই ওর কমফোর্ট সবার আগে আমাদের কাছে। হৃদয় কী সুন্দর করে জাভির যত্ন নিচ্ছে, দেখে আমার খুব ভালো লাগল। ন্যাপি পাল্টে দিল, নায়না খাবার তৈরি করে দিয়েছিল, তাই যত্ন করে খাওয়াল।সন্তানের দায়িত্ব কেবল মায়ের নয়; বাবারও অনায়াসে করতে পারে, হৃদয়কে দেখে এই সময়ের নতুন বাবাদের শেখার আছে।
ক্যাফেটার ভেতরে যেতেই মনে হলো ঊনিশ শতকের পুরোনো কোনও ইউরোপিয়ান ক্যাফেতে চলে এসেছি। পুরোনো কাঠের চেয়ার টেবিল, জ্বালানি কাঠ, কাঠের বুকসেল্ফ। হৃদয় বলল, ‘আপু, ইউ ক্যান বাই বুক ফ্রম হেয়ার।’
পুরোনো বই বিক্রি হচ্ছে মাত্র চার ডলারে আর ক্যাফে পুরোনো বই কিনছে দুই ডলারে। বিযষয়টা বেশ ভাল লাগল। আমাদের দেশের ক্যাফেগুলো এমন উদ্যোগ নিতে পারে। এতে করে বই পড়ার অভ্যাস কারও হলেও হতে পারে। আমি ‘অস্ট্রেলিয়ান শর্ট স্টোরিজ’ নামের একটা বই কিনলাম। যেই দেশে যাই, সেখানের সাহিত্যের সাধ নিতে আমার বেশ ভালো লাগে। আর ছোট গল্পের সংগ্রহ মানে সে দেশের অনেক বিষয় সম্পর্কে জানা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর আগে হাতে বেশ সময় আছে। সবাই যার যার মতো সময় কাটাতে পারি। আমি এক কাপ কফি আর একটা পিস্টাশিও সুইট নিয়ে বসলাম বিশাল জানালার ধারে। জানালার ওপারে নাম না জানা হলুদ ও লাল ফুল ফুটে আছে। বইটার সম্পাদক ম্যালবোর্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। বইটা খুলে গল্পের নামগুলো দেখতে দেখতে ভাবছিলাম কিছু গল্প বাংলায় অনুবাদ করবো হয়তোবা।
আগাথা তার ব্রেকফাস্ট প্লেট নিয়ে এসেছে। একে একে আসল জ্যাক, আইডেন ও দুইজন এবরোজিন ভদ্রমহিলা ও একজন ভদ্রলোক। পরিচিত হলাম সবার সাথে। আইডেন ম্যাডলো বাথ স্টেশন আপগ্রেড এন্ড পেডাস্ট্রিয়ান ফুট ব্রিজ কনস্ট্রাকশনের প্রজেক্ট ডিরেক্টর, হৃদয় প্রজেক্ট ম্যানেজার, আগাথা ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার ও জ্যাক কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার। আজকে যেহেতু উদ্বোধন, এবরোজিনদের ও আমাদেরসহ অন্য অনেক কমিউনিটি সদস্যকে দাওয়াত করা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ের প্রতিনিধি সমাজের নানা ধারার মানুষ এই সেতু পার হবে, তাই সব প্রতিনিধি নিয়ে সেতুর উদ্বোধন হয়।বিষয়টা আমার দারুণ লাগল!
অস্ট্রেলিয়ার এবরোজিনদের শৈল্পিক মনন এবং ওখানে এই জনগোষ্ঠিকে কতটা মূল্যায়ন করা হয়, তা না লিখলেই নয়। আমাদের দলে থাকা এই জনসম্প্রদায়ের মেয়েদের সাজসজ্জা আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে। তাঁদের জামা কাপড়ে বাহারি রঙের আধিক্য দেখা যায় এবং খোলা চুলে কিংবা বিনুনীতে সত্যিকারের ফুল দিয়ে সেজে থাকে, দেখতে অপরূপা লাগে।
কিছুদিন আগে হাঁটছিলাম সিডনির ডার্লিং হারবার ব্রিজে। ছোট ভাই হৃদয়কে জিজ্ঞেস করলাম অস্ট্রেলিয়ার পতাকার পাশে আঁকিবুঁকি করা ওটা কিসের পতাকা। বলল, এগুলো এবরোজিনদের প্রতীক। যদি বাংলায় বলি, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের চিত্রকর্ম। কিন্তু মনের ভেতর খচখচ করছে; Indigenous এবং Aboriginal- এই শব্দ দুটির কি কোনও পার্থক্য আছে? অবশ্যই আছে।
Indigenous যারা, তারা সে অঞ্চলের নিজস্ব জনগোষ্ঠি আর Aboriginal এসেছে অন্য কোনও অঞ্চল থেকে। এই যেমন, অস্ট্রেলিয়ার এবোরিজিনরা সেখানটায় গিয়েছিল ৪৫,০০০ থেকে ৫০, ০০০ বছর আগে পূর্ব এশিয়া থেকে (মূলত: মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, পূর্ব তিমুর, ইন্দোনেশিয়া, ও ফিলিপিনস)। অর্থাৎ, এই অঞ্চলের মানুষ বহুবছর আগেই সমুদ্র যাত্রার সাথে পরিচিত ছিল। তাই, Ab অর্থ From বা থেকে এবং Origine অর্থাৎ Origin বা মূল থেকে Aborigine শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে।
তারপর থেকে যেখানেই যাই এবরোজিনদের আর্ট চোখে পড়ছে বিশেষভাবে। ঋদ্ধির ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে শপিংমল- সবখানেই আলাদা করে আকর্ষণ করছে অনন্য সব রঙিন শিল্পকর্ম। ছবিগুলো অস্ট্রেলিয়ার এবরোজিনদের শৈল্পিক মনের পরিচয় বহন করে। ভীষণ রকম চকমকে রংয়ের ব্যবহার, চক্রাকার, প্রলম্বিত রেখা, পশুপাখির অবয়ব-সব মিলিয়ে কোনও এক অর্থের দ্যোতনা সৃষ্টি করছে এমন একটা অনুভূতি ছবিগুলোর দিকে টেনে নেয়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম আকর্ষণ এই এবরোজিনদের চিত্রকলা এতোটা আকর্ষণীয় হলেও এবরোজিনদের জীবন ততটা সুখকর ছিল না। আঠারোশ শতকে ব্রিটিশ রয়েল নেভির পক্ষ থেকে লেফটেনেন্ট জেমস কুক (১৭৮৮-১৯০১) কলোনি স্থাপন করলে এবরোজিনদের জীবনে অন্ধকার সময় নেমে আসে। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ এর দশকে বর্বরোচিত ঘটনার মধ্যে ছিল এবরোজিন শিশুদের আত্তীকরণের নামে এবরোজিন বাবা-মায়ের কোল থেকে নিয়ে কোনও সাদা পরিবারে দত্তক দেয়া কিংবা কোনও সামাজিক সংগঠনের কাছে হস্তান্তর করা। িঅস্ট্রেলিয়ান সরকারি নীতির অধীনে আদিবাসী শিশুদের পরিবার থেকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে মিশনারি ক্যাম্পে পাঠানো এই শিশুদের বলা হয় Stolen Generations অথবা চুরি হয়ে যাওয়া প্রজন্ম। কথিত আছে, প্রায় ১১,০০০ থেকে ১৪,০০০ এবরোজিনকে হত্যা করা হয়েছিল সে সময়।
বেশ কিছু বছর আগে ‘র্যাবিট-প্রুফ ফেন্স’ নামক একটি সিনেমা দেখেছিলাম অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সত্য ঘটনা অবলম্বনে। অস্ট্রেলিয়া গিয়ে আগ্রহ হলো এই বিষয়টি সম্পর্কে জানতে। ১৯৩১ সালের সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমার গল্পটি লেখেন মূল চরিত্র মলির মেয়ে ডরিস ফিলকিংটন গাড়িমারা এবং আত্মজীবনীমূলক বইটির নাম ফলো দ্য র্যাবিট-প্রুফ ফেন্স । স্টোলেন জেনারেশনস হওয়া থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে মলি, ডেইজি ও গ্রেসিয়া অস্ট্রেলিয়ার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ খরগোশ আটকানোর বেড়া অনুসরণ করে (প্রায় ২৪০০ কিলোমিটার)পথ হেঁটে নিজ গ্রামে ফিরে আসতে পারে কি না তার গল্প। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের নিয়ে নির্মিত এই সিনেমাটি এক সময় বেশ সাড়া জাগিয়েছিল।
মানুষ অমানবিক হয়ে ধ্বংস করতে পারে মানুষের পরিচয়; কিন্তু পারে না তার নান্দনিক সত্তাকে চিরতরে দাফন করতে। সুকুমার বৃত্তি, নান্দনিক সত্তা, শৈল্পিক উপস্থাপনা সকল সময় ও পরিস্থিতির ঊর্ধ্বে নিজের অবস্থান জানান দেয়। যেমনটা এখন দেখা যায় অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করা এই এবরোজিনাল চিত্রকর্মে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণ এখন এই শিল্প নিয়ে দুনিয়া জুড়ে গর্ব করে; সেখানকার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটা শক্তপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে এবরোজিনদের চিত্রকর্ম। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক সকল আয়োজনে অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে এই আদি জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে থাকে।
হৃদয় একাধারে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও স্থপতি এবং এই প্রজেক্টের সর্বকনিষ্ঠ প্রজেক্ট ম্যানেজার। তার ডিজাইন ও তত্ত্বাবধানে সিডনিতে একটা ব্রিজের উদ্বোধন এবং সেখানে এশিয়ান কেবল হৃদয়; বাকিরা অস্ট্রেলিয়ান। হৃদয়ের কলিগরা ঠিক সময়ে প্রজেক্টের কাজ শেষ করতে পেরেছে বলে অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমরা পর্যটক হিসেবে আমার ছোট ভাইয়ের মেধা ও মননের কারণে আজ সম্মানিত হলাম। আমার খালা গিয়েছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে আর জাভি হলো সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি; এবরোজিনদের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছিল এক সময়, তার প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ সব রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক অনুষ্ঠানে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন সে তিনজন নারী-পুরুষ; আর ছিল ওই এলাকার গণ্যমান্য ও সাধারণ ব্যক্তিবর্গ। সবার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ জমে উঠতেই খবর এল সিডনির তিনজন সংসদ সদস্য এসে পৌঁছেছেন। আমরাও সবাই তখন হাঁটা দিলাম নান্দনিক সে ব্রিজ উদ্বোধন করার কাফেলাতে যোগ দিতে।
নতুন ব্রিজের ওপর দিয়ে যেতেই নিচে চোখে পড়ল একটা অস্ট্রেলিয়ান হেভি ট্রেনের হেলেদুলে যাওয়ার দৃশ্য। জ্যাকের একটা বিষয় আমার খুব ভাল লেগেছে। তিনি যখন যেখানে প্রজেক্ট পেয়ে থাকেন, সেখানকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে পড়ালেখা করেন। এই জ্ঞানার্জন একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে তাঁর কাজের প্রতি ও সে স্থানের প্রতি আরও বেশি আন্তরিক করে তোলে। তাঁর কাছ থেকেই হৃদয় শুনেছিল ১৭৮৮ থেকে ১৮৬৮ সময়ের মধ্যে ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ড থেকে আগত বন্দিরাই প্রথম ব্লু মাউন্টিনসে কাটুম্বা সিনিক রেইলওয়ে তৈরি করেছিল ।
আরও মজার ব্যাপার হলো, ম্যাডলো বাথ এলাকার মানুষজন তাঁদের এলাকার ঐতিহ্য ধরে রাখতে বদ্ধ পরিকর। এই ব্রিজটি তৈরি করার আগে তার ডিজাইন ওই এলাকার প্রতিনিধিদের দেখাতে হয়েছে যেন তাদের এলাকার স্থাপনা তৈরিতে ঐতিহ্য রক্ষা করা হয়। একটা এলাকার স্থাপত্যশৈলী কেমন হবে তা ভাবার অধিকার আছে সেই এলাকার মানুষের-কি সুন্দর ব্যবস্থাপনা!
রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা মাত্র দশ মিনিটের মতো সময় নিয়ে নিজেদের অভিব্যক্তি জানালেন। সেখানে ছিল না কোনও পুলিশি প্রটোকল, ছিল না ‘অমুক ভাই এর চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র’ ধরনের স্লোগান, ছিল না ছবি তোলার জন্য কোনও ধাক্কাধাক্কি। বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে , কথা বলছে, হাসছে সবার সাথে। সত্যিকার অর্থেই একটা আনন্দঘন পরিবেশ।
বৃদ্ধ নর-নারী, অন্তঃসত্ত্বা ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের সুবিধার জন্য ব্রিজের ওপরে আছে একটি লিফট। দুজন সংসদ সদস্য লিফ্ট উদ্ভোদন করতে যাচ্ছেন, সাথে ডেকে নিলেন আন্টি, জাভি, একজন অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী মহিলা, প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে হৃদয় ও আমাকে।কী অমায়িক তাদের আচরণ!আমার তখন মনে হলো, অস্ট্রেলিয়ানদের আমরা অনেক বর্ণবাদী হিসেবে জানি; তবে মেধার মূল্য দিতে তার জানে-এই কথা মানতেই হবে! হৃদয় নির্ধারিত বাজেট ও সময়ের মধ্যে কাজটা করতে পেরেছে বলে খুব প্রশংসিত হচ্ছিল।
সে লিফটে যেতে পেরে জাভিয়ান ভীষণ খুশি! সে তার দাদি ও বাবার আঙ্গুল ধরে আনন্দে হাঁটাহাঁটি করছে। তিন প্রজন্মের এই মিলনমেলা তাদের জন্য নিশ্চয় চমৎকার এক স্মৃতি হয়ে রইল।
সেখান থেকে আমরা লাঞ্চ করতে গেলাম এড়েঞ্চো সাইট অফিসে। পাস্তা সালাদ, রোস্ট চিকেন, সালামি, রাশান সালাদ ও পছন্দের সব পানীয়। আমরা সবার সাথে গল্প করতে করতে উপভোগ করছিলাম। আমাদের খাওয়ার সময় আগাথার কোলে জাভিয়ানকে দেখে আমি একটু অবাক হলাম। আমরা প্র্যাম নিয়ে গিয়েছিলাম; কিন্তু জাভিকে একজন বিদেশিনীর আগলে রাখার দৃশ্যটা সত্যিই অভাবনীয়! জাভিও বেশ সাবলীল আগাথার সাথে।
জ্যাক এক পর্যায়ে জাহিদকে প্রশ্ন করে বসলো, ‘Did you join navy because of your love for war?’ প্রশ্নটা করে মজার একটা হাসি দিল। জাহিদ জবাব দিল ‘Not to start war, but to stop.’ সত্যি কথা বলতে কী, জাহিদ নিজেও হয়তো এভাবে আগে ভাবেনি; তবে ওর জবাবটা আমাদের সবার পছন্দ হলো। আমরা সবাই অনুভব করলাম, যুদ্ধ আসলে কেউই চায় না, তবুও যুদ্ধ বাধে।
আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে চা-কফি খেতে চলে গেলাম ম্যাডলো বাথের অন্যতম আবাসিক হোটেল The Hydro Majestic এ। এই হোটেলটি মার্ক ফয় ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করে। হোটেলটির স্থাপত্যশৈলী ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ইউরোপিয়ান ধারা বজায় রাখা হয়েছে। দেয়ালের গায়ে তৈলচিত্র কেমন ইতালিয়ান ভাবধারার। এই হোটেলে অনেক নামি দামি সেলিব্রিটি এসে থাকে। আর যখন জানলাম, বিখ্যাত ‘শার্লক হোমস’-এর স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল এখানে থেকেছেন কিছুদিন, অন্যরকম ভালো লেগেছিল। হোটেলটির লবিতে বসে ব্লু মাউন্টিনসের শাড়ির কুচির ভাঁজের মতো পর্বতমালা আর শেষ বিকেলের আলোর নাচন মনটাকে কিছুটা সময়ের জন্য এক মায়াজগতে নিয়ে যায়!
ফিরতে ফিরতে জাভির গাড়িতে চাইল্ড সিট থেকে আমার কোলে এসে ঘুমিয়ে পড়াতে আমি বহুবছর পর আমার ছোট্ট ঋদ্ধি-রাকিমের শৈশবের স্পর্শ অনুভব করছিলাম।
একটা বিষয় মাথার ভেতর ঘুরছে; একটা স্থাপনা তৈরিতে নামফলকে যারা ডিজাইন ও নির্মাণ করে তাদের নাম রাখা যেতে পারে, কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তির নয়।
