ঘাসফড়িং সাহিত্য পত্রিকাএকটি সাহিত্য আড্ডা
  • হোম
  • গল্প
  • কবিতা
  • প্রবন্ধ
  • উপন্যাস
  • সকল বিভাগ
  • যোগাযোগ
  • সম্পাদকীয় নীতিমালা

ঘাসফড়িং

একটি সাহিত্য আড্ডা

অন্বেষণ করুন

  • হোম
  • গল্প
  • কবিতা
  • প্রবন্ধ
  • উপন্যাস
  • সকল বিভাগ
  • যোগাযোগ
  • সম্পাদকীয় নীতিমালা

সামাজিক যোগাযোগ

  • Facebook
যোগাযোগ করুন

© 2026 ঘাসফড়িং. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

সম্পাদকঃ আমিনুর রহমান খান | নির্বাহী সম্পাদকঃ মাসুদ আনোয়ার | প্রকাশকঃ রওশন আরা মুন্নি | ওয়েবসাইট নির্মাতা: উৎসর্গ রায়

গোপনীয়তা নীতি

A product of WebPortray

স্মৃতিকথা

দুই পয়সার শৈশব

লুৎফর রহমান রিটন৮ অক্টোবর, ২০২৬৪০২৮ শব্দ · ⏱ পড়তে আনুমানিক ২১ মিনিট লাগবে
দুই পয়সার শৈশব

[লুৎফর রহমান রিটন শুধু তুখোড় ছড়াকার, একজন চৌকস গদ্যকারও। এ লেখাই তার প্রমাণ। চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন বালকের দু:খ নামে নিজের `মুসলমানি‘র স্মৃতি। ]

বালকের দু:খ বোঝে না এই ধরিত্রি…

ছেলেবেলায় একবার গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম পুরো ফ্যামিলি,দল বেঁধে। আমাদের সেই গ্রামযাত্রার পেছনে একটা পৈশাচিক পরিকল্পনা ছিলো বাবার। আর সেটি ছিলো আমাকে ঘিরে বা আমাকে কেন্দ্র করে। আমাকে নাকি মুসলমানী করানো হবে। আর এই কাজে গ্রামের হাজাম হচ্ছেন পৃথিবীর সেরা সার্জন। কাটাকাটির কাজটা বিখ্যাত সেই হাজামই করবেন। শুনে তো দিশেহারা হয়ে পড়লাম। আমার 'মুসলমানী' করানোর বীভৎস পরিকল্পনাটা সবাইকে আনন্দিত করছিলো কিন্তু আমি ছিলাম ভয়ার্ত। একজন কিশোরের ইয়ে কাটা নিয়ে এরকম পৈশাচিক আনন্দে মেতে ওঠা মানুষগুলোকে আমার মনে হচ্ছিলো পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মানুষদের প্রতিনিধি। একটি বালকের প্রতি ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা চালানো উপলক্ষ্যে আত্মীয়পরিজনসমেত এলাকার মানুষদের মিষ্টিমুখ করানোসহ দ্বিপ্রাহরিক একটা ভোজেরও পরিকল্পনা ফাইনাল করা হয়েছিলো। আমার প্রতি সংঘঠিতব্য নৃশংসতাকে সেলিব্রেট করতেই আমাদের সেই গ্রামযাত্রা। কী আর করা। সংসারে ছোট্ট একটা বালকের কোনো ক্ষমতাই থাকে না বড়দের 'ভুল সিদ্ধান্ত'কে প্রতিরোধের বা প্রতিহতের। সুতরাং বলীর পাঁঠা হিশেবে বাবা মায়ের লাগেজ-পেট্রার সঙ্গে এক সকালে আমিও রওনা হলাম গ্রাম অভিমুখে।

সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছে মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠলো। বিশেষ করে লঞ্চে ওঠার পর এবং লঞ্চটা আমাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করার পর স্নিগ্ধ সকালের ফুরফুরে হাওয়ায় নিজেকে বলীর পাঁঠা ভাব্বার ফুরসত পেলাম না আর। বিরতিহীন ভাবে কিছুক্ষণ ভেঁপু বাজিয়ে লঞ্চ স্টার্ট নিল। গাড়ির মতোই প্রথমে ব্যাক গীয়ারে গিয়ে তারপর ডানদিকে চলতে শুরু করল লঞ্চটা। লঞ্চটা যিনি চালাচ্ছেন তিনি কোনো ড্রাইভার নন। তিনি 'সারেঙ'। লঞ্চ-স্টিমার-জাহাজের চালকরা কেউই ড্রাইভার নন। সবাই তাঁরা সারেঙ। লঞ্চ এগিয়ে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদীর জলসমুদ্র কেটে কেটে। গন্তব্য আমাদের বাঞ্ছারামপুর।

দারূণ অভিজ্ঞতা হলো লঞ্চে। দোতলা লঞ্চ। অপেক্ষাকৃত গরিব যাত্রীরা যাচ্ছে নিচতলায়, গাদাগাদি করে বসে। সিট না পেয়ে ফ্লোরে কাপড় বিছিয়েও বসে পড়েছে অনেকে। ওপর তলায় আলাদা আলাদা কেবিন না থাকলেও বেশ বড়সড় গণকেবিন আছে একটা। এখানে খানিকটা আরামদায়ক ফোম আর রেক্সিনের টানা লম্বা সিট। খুব সুবিধেমতো কর্ণারে আমাদের সিটগুলোর দখল নেয়া হলো।

লজেন্স চানাচুর ঝালমুড়ি চিনেবাদাম সেদ্ধডিম আর আচারওয়ালারা কিছুক্ষণ পর পর হাঁক দিচ্ছিল কেবিনের দরোজা আর জানালার সামনে এসে। আমার বয়েসী একটা ছেলে বারবার আমার জানালার কাছে এসে আমার কাছে খুব কমদামি কিছু লজেন্স বিক্রি করতে চাইছিল। আমাদের সঙ্গে খানাখাদ্য ছিল প্রচুর। তাছাড়া সেই বয়েসে একটা টাকাও ছিলো না পকেটে। সুতরাং আমার বয়েসী ছেলেটার কাছ থেকে লজেন্স কেনার কোনো সুযোগ আমার ছিল না। কোনো রকম মন খারাপ না করেই অবশ্য ছেলেটা আমার কাছ থেকে চলে গিয়েছিল অন্য কাস্টমারের খোঁজে।

বাবার অনুমতি নিয়ে 'সাবধান থাকার শর্তে' কেবিন থেকে বেরিয়ে মনটা আমার খুশিতে ভরে গেল। কী সুন্দর বাতাস! আমার মাথার চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে গেল। এই এলোমেলো হয়ে যাওয়াকে আসলে বলা উচিৎ আউলাঝাউলা হয়ে যাওয়া। আমি আমার আউলাঝাউলা চুল কিছুতেই সামাল দিতে পারছিলাম না।

এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। এই দিকটায় বাতাসের দাপট আরো বেশি। লঞ্চ যাচ্ছে নদীর প্রায় মাঝখান দিয়ে। দু’পাশে মোটা ব্রাসে টানা সবুজ রঙের দুটো স্ট্রোকের মতো গ্রামের গাছগুলো দেখা যাচ্ছে। কোনো কারণ ছাড়াই লঞ্চের সারেঙ ভেঁপু বাজালেন—ভুঁউউউউট। আমি খানিকটা চমকে পেছনে তাকালাম। চালকের আসনে বসা সারেঙ আমার দিকে হাত নাড়ালেন। জবাবে আমিও নাড়ালাম। সারেঙ লোকটাকে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। আমাকে চমকে দিতেই ব্যাটা ভেঁপুটা বাজিয়েছে।

লঞ্চটা দেড়তলা। মন চাইলো একটু নিচের ফ্লাটটা ঘুরে আসি।

দোতলা থেকে নিচতলায় যেতে হলে ছয়-সাত স্টেপের ছোট্ট একটা সিঁড়ি ভাঙতে হয়। সিঁড়িটা একটু খাঁড়া। তবে ডানদিকে হাতল আছে। ওটা ঠিকমতো ধরে স্টেপ নিলেই নামাটা বিপজ্জনক নয়। এই সিঁড়ির ডানদিকে জায়গা খুব বেশি প্রশস্ত নয়। তাছাড়া কোনো রেলিঙও নেই এখানটায়। বড়জোড় ফুটখানেক উঁচু টানা একটা সীমানা প্রাচীর আছে। নিয়মিত লঞ্চে আসা যাওয়া করেন এমন লোকজন ওখান দিয়ে চলাচল করতে পারেন অনায়াসে কিন্তু আমার মতো পেসেঞ্জার হলে খবর আছে।

প্রথমে নামলাম দোতলা আর নিচতলার খুদে করিডোরে। ওখান থেকে এবাউট টার্ণ হয়ে আরেকটা আট দশ স্টেপ সিঁড়ি ভাঙতে হলো। তবে এখানে কোনো বিপদ নেই। আর এটা তেমন খাঁড়াও না।

নিচ তলাটা ইঞ্জিনের শব্দ বাতাসের শব্দ আর জলের শব্দ মিলেমিশে এমন একটা শব্দময় এলাকা যে এখানে কথা বলতে হয় চিৎকার করে। তা না হলে কোনো কথাই শোনা যায় না। ইঞ্জিন বাতাস আর জলের শব্দের সঙ্গে মানুষের উচ্চকণ্ঠের কথাবার্তার মিশ্রনে একটা অদ্ভুত পরিবেশ এখানে। লঞ্চের দুপাশেই টানা লম্বা দীর্ঘ বেঞ্চি। সেই বেঞ্চিতে এক ইঞ্চি ফাঁক নেই এমন ঠাঁসাঠাসি করে লোকজন বসেছে। আর যারা বেঞ্চিতে চান্স পায়নি তারা বসেছে ফ্লোরে চাদর কিংবা মাদুর পেতে। মানুষের হাঁটাচলার জন্যে দু’পাশেই খানিকটা স্পেস অবশ্য ছেড়ে দেয়ার নিয়ম কিন্তু সবাই সেই নিয়ম মানছে না। ‘এই যে ভাই একটু যাইতে দ্যান প্লিজ’ কিংবা ‘এই যে ভাই একটু সইরা বসেন’ বলতে বলতে এগোতে হয় ইঞ্জিনের দিকে। এই জায়গাটায় শব্দ এতো বেশি যে ছুঁয়ে দেয়া দূরত্বে থাকা মানুষটার কথাও বোঝা মুশকিল। ফেরিওয়ালারা ওপর তলা থেকে নিচ তলায় বেশি তৎপর। এখানেই ওদের বিক্রি বেশি। বেশ খানিকটা দূরে লজেন্স বিক্রেতা ছেলেটাকেও দেখলাম মহা উৎসাহে লজেন্স বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই এতো মিষ্টি করে হাসলো ছেলেটা! আমিও হাসলাম।

চলে এলাম লঞ্চের একদম পেছনটায়। এখানে দুটো টয়লেট আছে পাশাপাশি। তুলিতে শাদা রঙে একটায় লেখা ‘পুরুষ’ অন্যটায় ‘মহিলা’। খুবই ছোট্ট একটা করিডোরের মতো জায়গা আছে এখানটায়। করিডোরের দুদিকেই হাট করে খোলা। কোনো দরোজা বা দেয়াল নেই ওখানে। লোহার মোটামুটি লম্বা একটা শেকল দিয়ে বাঁধা একটা ছোট বালতি আছে একপাশের খোলা অংশে। একজনকে দেখলাম শেকলবাঁধা বালতিটাকে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে অপূর্ব দক্ষতায় পানিভর্তি বালতিটাকে টেনে তুলে এনে একটা সিলভারের বদনায় সেই পানি ভরলেন। তারপর ‘পুরুষ’ লেখা টয়লেটে ঢুকলেন আমাদের দিকে মুচকি হেসে। পৃথিবীতে একটা বিরাট আবিস্কার হচ্ছে এই বদনা। অথচ এর আবিস্কারকের নাম কোথাও লেখা নেই। এরকম ইউজফুল একটা জিনিসের আবিস্কারকের প্রতি আধুনিক শিক্ষিত লোকজন খুব অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। অথচ এই বদনা ছাড়া মানুষের চলে না।

এই করিডোর দিয়েও ওপরে ওঠার ব্যাবস্থা আছে। তবে সিঁড়ি নেই। পেট সমান উঁচু একটা লেভেলে জানালা টাইপের খোলা একটা ফোকরের ওপারেই লঞ্চের ওপরতলার প্যাসেজ। লোকজন অদ্ভুত দক্ষতায় দু’হাতে সেই ফোকরের দুপাশের কাঠের পাটাতনের ওপর শরীরের ভর রেখে শরীরে শিম্পাঞ্জির মতো একটা দুলুনি টাইপের ঢেউ তুলে সাঁই করে ওপরে উঠে যায়।

এবার ওপর তলায় যাবো। এক ভদ্রলোক দুহাতে উঁচু করে ধরে সেই ফোকর দিয়ে ওপর তলায় ঠেলে তুলে দিলেন আমাকে। তারপর শিম্পাঞ্জির মতো ছন্দোময় ঢেউ তুলে নিজেও উঠে এলেন!

ওপর তলার একদম পেছন দিকটায় একটা উঁচু জায়গা। ছোট্ট রেলিঙ ঘেরা। এটা হচ্ছে নিচ তলার টয়লেট এবং টয়লেট লাগোয়া ছোট্ট করিডোরের ছাদের অংশ। এখানে একটা বড় ড্রামের মতো জিনিস আছে। ওটা দিয়ে ধোঁয়া বেরোয়। ইঞ্জিনের ধোঁয়া। ড্রামের মধ্যে খুব মোটা আর বড় হরফে লেখা ‘নামাজের স্থান’। এখানে কয়েকজন লোক নামাজ পড়ছেন। নামাজ পড়তে হয় পশ্চিম দিকে সেজদা দিয়ে। তাঁরা পশ্চিম দিকে সেজদা ঠিক করেই নামাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই লঞ্চ একটু ডানে বাঁক নিতেই তাঁদের সেজদার দিক গেলো পালটে! যাঁরা নামাজ পড়ছিলেন তাঁরা কিন্তু দিক না পাল্টেই নামাজ বহাল রাখলেন।

দোতলার যাত্রীদের কেউ কেউ কেবিনের পেছনের বিশাল ফাঁকা জায়গাটায় চাঁদর এবং টাওয়েল পেতে বসেছেন বাইরের বিশুদ্ধ হাওয়া খাওয়ার জন্যে। ওখানে কিছুক্ষণ বিশুদ্ধ বায়ুসেবন করে ফিরে এলাম কেবিনে।

কেবিনের যাত্রীরা দিনদুনিয়ার নানান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মত দিচ্ছেন যে যার মতো। এখন টিভিতে যেমন টক শো হয় তেমনি কিছু সবজান্তা লোক অবিরাম তর্ক করছিলো। গ্যাস নাই কারেন্ট নাই পানি নাই টাইপের টপিকে মেতে ছিলো লোকগুলো। ওদের সঙ্গে বিপুল উদ্যমে অংশ নিচ্ছিলেন সরকারি চাকুরে আমার বাবাও। আলোচকরা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন সব্জান্তাদের উদ্দেশে–বলুন তো জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, বাস ভাড়া ট্রেন ভাড়া লঞ্চ ভাড়া বাড়ছে তো বাড়ছেই, তারপর লোডশেডিং, ওয়াশার কলে পানি নেই, পথে ঘাটে বেওয়ারিশ কুকুরদের উৎপাত, মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই, এমন দেশে কি বসবাস করা যায়? বলুন যায়? দেশটা রসাতলে যাচ্ছে…

সারেঙ-এর কাছে গেলাম পায়ে পায়ে। সারেঙ-এর রুমটা লম্বাটে সরু আর চ্যাপ্টা মতোন। লঞ্চের স্টিয়ারিংটা ঠিক গাড়ির স্টিয়ারিং-এর মতো না হলেও মিল আছে বেশ। লঞ্চটা চালাতে হয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আর সে কারণেই পেছনে একটা টানা লম্বা বেঞ্চির ব্যাবস্থা থাকার পরেও সরু লম্বা এবং খাঁড়া একটা টুলও আছে স্টিয়ারিং বরাবর। পায়ে ঝিঁঝিঁ লাগলে এই টুলে বসেও সারেঙ লঞ্চটা চালান।

আমাকে অনেক সম্মান দেখালেন সারেঙ চাচা।

সারেঙ চাচা আমাকে—‘কিছুক্ষণ লঞ্চটা চালাইতে চাও নাকি ভাতিজা?’ জিজ্ঞেস করলে আমি তো খুশিতে লাফিয়ে উঠলাম—চাই চাই। দেবেন আমাকে চালাতে? আমি কি পারবো চাচা?

–পারবা পারবা আসো লঞ্চ চালান খুব সোজা। দুনিয়াতে সবথিকা সোজা হইলো গিয়া লঞ্চ চালানি। হেহ হেহ হে…

সারেঙ চাচা আমাকে তাঁর পাশে দাঁড় করিয়ে আমার হাতে স্টিয়ারিং ধরিয়ে দিলেন—ইঞ্জিন যদিও পানি কাইট্টা কাইট্টা লঞ্চটারে চালাইয়া নিবো সামনের দিকে কিন্তু বাতাস আর গাঙ্গের স্রোত তোমার লঞ্চটারে খালি ডাইনে বামে কান্নি খাওয়াইতে চাইবো। সারেঙ হিশাবে তোমার দায়িত্ব হইলো গাঙ্গের পানির স্রোত আর বাতাসের লগে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইটা চালাইয়া যাওয়া। বাতাস আর গাঙ্গের পানির লগে হাইরা যাওনের অর্থ হইলো নিগ্‌ঘাত লঞ্চডুবি।

মিনিট খানেকেরও কম সময়ের মধ্যে আমি স্টিয়ারিংটা সারেঙ চাচাকে ফেরত দিলাম। বাপ রে বাপ কী যে শক্তি লাগে সারেঙ হতে হলে! আমার তো ভয়ই করছিলো রীতিমতো—এই বুঝি লঞ্চটা ডানদিকে ছুটে গেলো। এই বুঝি হেলে পড়লো বাম দিকে।

স্টিয়ারিং-এ নিজের দখল নিয়ে সারেঙ চাচা বললেন—‘ভাতিজা মনে হয় ইট্টু ডরাইছো? আমি যে খুব গুপনে আগে থিকাই লঞ্চের স্পিড দিছি কমাইয়া হেইডা খেয়াল করো নাই!’ বলতে বলতে স্পিড বাড়াতে থাকলেন সারেং চাচা। সারেঙ চাচার স্টিয়ারিং-এর ডানপাশে একটা দড়ি। দড়িটা একটা গোলাকার ফোঁকড় গলে নিচের তলায় চলে গেছে। এই দড়িটা টান দিলে নিচে একটা ঘন্টার মতো কিছু একটা বেজে ওঠে। এটা তার বিশেষ কোনো সিগনাল বলে মনে হলো। এর মাধ্যমে তিনি বোধ হয় কোনো ম্যাসেজ পাঠান নিচ তলার সহকর্মীদের কাছে।

ষাট সেকেণ্ডের কম সময়ের জন্যে হলেও এই লঞ্চ চালানোর অভিজ্ঞতাটা আমার জীবনে বিরাট একটা এডভেঞ্চারের স্মৃতি হয়ে থাকলো।

মাঝে মধ্যেই নদীতে ভুস করে ভেসে উঠছে বিশাল আকারের কালো একটা মাছ। মাছটা একটা ঢেউ খেলানো ভঙ্গিতে কয়েকটা ডিগবাজী খায় তারপর ডুবে যায় পানিতে। লঞ্চ থেকে মোটামুটি নিরাপদ দূরত্বেই চলে ওদের ডিগবাজি ডিগবাজি খেলা। লঞ্চের খুব কাছে ওরা আসে না। জানলাম, এটা শুশুক। কেউ কেউ বললেন–ওটা শিশু। শুশুক বা শিশুকে তাঁরা মাছই বললেন। তখনও জানা হয়নি আমার–শুশুক নামের এই প্রাণিটা ডলফিন গোত্রের।

বিকেলে বাঞ্ছারামপুর ঘাটে আমাদের লঞ্চ ভিড়ল। অধিকাংশ যাত্রী এখানেই নামবে। মাঝে হোমনা, রামকৃষ্ণপুর আর দড়িকান্দি নামের কয়েকটি ঘাটেও লঞ্চ ভিড়েছিল। অল্প কজন যাত্রী ঘাট তিনটায় ওঠানামা করেছে। বুঝতে পারলাম বাঞ্ছারামপুরই হচ্ছে মেইন স্টপেজ মানে মূল ঘাট। লঞ্চ থেকে কাঠের একটা সিঁড়ি ঘাটের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হলো। খুব রিস্কি। পা ফেলতে সামান্য হেরফের হলেই ঝুপ করে পানিতে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। কিন্তু অবাক কাণ্ড কেউ পড়ে যাচ্ছে না। যাত্রীরা অভ্যস্ত। কিন্তু আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। এই রকম নড়বড়ে খাঁড়া হাতলছাড়া একটা সিঁড়িতে জিমন্যাস্টিক করতে পারবো না আমি। মুহূর্তেই বিকল্প ব্যাবস্থা করে ফেললেন বাবা। আমরা নিচ তলায় নেমে এলাম। নিচ তলার জানলার কাছে একটা নৌকো বাঁধা হলো। এরপর বাবা অন্যান্য ভাইবোনের সঙ্গে আমাকে জানলা দিয়ে গলিয়ে দিলেন নৌকোর পাটাতনের ওপর দাঁড়ানো মাঝির হাতে। মাঝি আমাকে নিপুণ কায়দায় নৌকোর মধ্যে তুলে নিলেন। নৌকোটা দুলছে। আমি বসেছি পাটাতনের ওপর। আমাদের লাগেজগুলো বাবাকে রিসিভ করতে আসা লোকজন মাথায় করে সেই বিপজ্জনক সিঁড়ি দিয়েই বলতে গেলে নাচতে নাচতে নেমে গেল!

লঞ্চ থেকে নেমে হাঁটাপথে যাচ্ছি আমাদের গ্রামের দিকে। হাঁটছি আমরা উঁচু সড়ক ধরে। সড়কটা পাকা নয়। সড়কের দুদিকই নিচু হয়ে নেমে মিশে গেছে হয় কোনো বাড়ির আঙিনায় কিংবা বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেতের সঙ্গে। ধানের ক্ষেতের পরেই ছোট্ট একটা নদী। নদীর ওপারে বাবার জন্মগ্রাম। বাবার সঙ্গে অনুসরণকারী হিশেবে পেছনে আছে ছোটোখাটো একটা মিছিল। সেই মিছিল ক্রমশ বড় হচ্ছে। একজন দুজন করে একটু পরপর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন উৎসাহী মুখ। ফলে মিছিলটা দীর্ঘ হচ্ছে আস্তে ধিরে। সড়কে আমাদের বিপরীত দিক থেকে আসা লোকজন অবাক হয়ে বাবাকে দেখছে। কেউ কেউ লম্বা সালাম বিনিময় করছে। কেউ কেউ আবার জুড়ে দিচ্ছে প্রচুর অহেতুক খুচরো আলাপ। একটুও বিরক্ত না হয়ে বাবা প্রায় সবার সঙ্গেই হাসিমুখে শামিল হচ্ছেন। এই দরীদ্র মানুষগুলো ছুঁয়ে দেয়া দূরত্বে বাবার সঙ্গে হাঁটছে, কথা বলছে।

নদীর ঘাটে আসা অব্ধি মিছিলটা আমাদের ফলো করল। চারিদিক উন্মুক্ত কোনো ছাউনি নেই এমন দুটি ছোট্ট নৌকোয় আমরা উঠেছি। এই ধরণের নৌকোকে বলে কোশা নৌকো। নৌকো দুটো ঘাটেই বাঁধা ছিল। নৌকোর মাঝির আসনে লগি হাতে প্রস্তুত হয়ে আছে চালক অর্থাৎ মাঝি।

নদীটা ছোট। মনে হলো খুব বেশি গভীরও নয়। কারণ লগিটা নদীর তলানিতে পৌঁছেও পাঁচ-ছয় ফুট বাড়তি আছে। কয়েক মিনিট পরেই বুঝতে পারলাম আমার ধারণা সঠিক নয়। নদীটা অনেক গভীর। কারণ নদীর মাঝখানটায় এসে মাঝি লগি দিয়ে আর নদীর তলানি মানে মাটি ছুঁতে পারছিল না। লগিটা লম্বালম্বি নৌকোর ওপর রেখে একটা বৈঠা দিয়ে মাঝি নৌকোটা চালাতে শুরু করলেন।

নদীর মাঝখানে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। কয়েকটা বাঁশের সাহায্যে আঁড়াআড়ি করে একটা উন্মুক্ত মাঁচার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে রোদেপোড়া কালো কুচকুচে চেহারার একটা লোক মাছ ধরছেন। তাঁর মাছ ধরার কায়দাটা বিস্ময়কর। একটা বাঁশের খানিকটা অংশ লোকটার পায়ের কাছে উবু হয়ে আছে। বাঁশের বাকি অংশ লোকটার সামনের দিকে পানির ভেতরে সেঁধিয়ে আছে। লোকটা আঁড়াআড়ি ভাবে থাকা একটা বাঁশকে বাঁ হাত দিয়ে ধরে রেখে আরেকটা বাঁশের সঙ্গে ঝুলে থাকা মোটা দড়িটা ডান হাতে ধরে পায়ের কাছে উবু হয়ে থাকা বাঁশের ওপর দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা ঢেউ খেলানো দোল দিলেন। নিম্নমুখী দোল। লোকটার শরীরের ভার আর দোলের শক্তির চাপে উবু হওয়া বাঁশের অংশটা ধিরে ধিরে একটা সমান্তরাল অবস্থানে উঠে এল আর লোকটার সামনে ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠল সেই বাঁশের পানিতে সেঁধিয়ে যাওয়া অংশটা। যেখানে আরো তিনটে সরু বাঁশকে সিঙ্গারার মতো ত্রিকোণ আকৃতির শেপে জোড়া দিয়ে মোটা দড়ি আর সুঁতোর সাহায্যে জুড়ে দেয়া হয়েছে জাল। বেশ বড় জাল। বাঁশের ফ্রেমে আটকে থাকা জাল ক্রমশ উঁচুতে উঠলে দেখা গেল বেশ কিছু ছোট আর মাঝারি সাইজের মাছ জালের মধ্যে আটকে পড়ে সমানে লাফাচ্ছে। বিস্ময়ে হতবাক আমি—কী আশ্চর্য!এইভাবে মাছ ধরে নাকি!

নৌকো থেকে নেমে বিভিন্ন ক্ষেতের আইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বাঁশগাড়ি গ্রামে। খুব বেশি বড় নয় গ্রামটা। পুব পাড়া আর পশ্চিম পাড়া মিলিয়ে শ’খানেক পরিবারের ছোট্ট একটা গ্রাম। পূব আর পশ্চিম পাড়ার মাঝখানে মিনিট কুড়ির হাঁটাপথের একটা গ্যাপ আছে। এই গ্যাপটায়, চতুর্দিকে বেশ কিছু ফসলি জমি আর বিশাল বিশাল গাছ। একটা গাছের গোড়া অর্থাৎ মাটির ভেতর সেঁধিয়ে যাওয়া শেকড়-বাকড়গুলোর বড় রকমের অংশ বাইরে বেরিয়ে আছে। ইয়া মোটা মোটা শেকড়গুলো যে যেদিকে পেরেছে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এর গলা ধরে ওর পেটের ওপর দিয়ে এর সঙ্গে গিটঠু পাকিয়ে ওর সঙ্গে কঠিন একটা জুজুৎসুর প্যাঁচ লাগিয়ে মাটির তলায় ঢুকেছে। এই গাছের নাম বট গাছ। অর্থাৎ কিনা বটবৃক্ষ। সূর্যের চকচকে আলোয় চারিদিক সয়লাব হয়ে গেলেও এই বট গাছের নিচে অদ্ভুত একটা ছায়াময় মায়াময় পরিবেশ বিরাজ করছে।

(দুদিন পর এই বট গাছের ছায়ায়, এই শেকড়ের ওপর বসে থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছি আমি।)

বাবা যেদিকেই যাচ্ছেন তাঁর পেছন পেছন ছোটোখাটো একটা মিছিল থাকছেই। অবিরাম সিগারেট ফোঁকা বাবার অভ্যেস। গ্রামেও সেটা চলছে। সিগারেট ক্রমশ ছোট হয়ে এলে, ফিল্টারের কাছে আগুন পৌঁছানোর খানিক আগে বাবা সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন ডান কিংবা বামদিকে। বাবার ফেলে দেয়া সিগারেটের টুকরোটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে কয়েকজন। তারপর কোনো একজন বাবার উচ্ছিষ্ট সেই সিগারেটের টুকরোটা অনেক যত্ন করে তুলে নিয়ে মহা আয়েসে সুখটান দিচ্ছে।

কুড়িয়ে পাওয়া সিগারেটের অংশ তুলে নিয়ে ওদের একজন বলল—আহ্‌হারে দোতালা সিগারেট। অনেক দামি। নে তুইও খা, বলে বাড়িয়ে দিল অন্যজনকে।

দৃশ্যটা আমার কাছে খুব খারাপ লাগল। এই লোকগুলো কত্তো গরিব! একটা সিগারেট কেনার মতো বাড়তি টাকাও নেই ওদের! বাবার ফেলে দেয়া টুকরোটা ওদের কাছে মনে হচ্ছে স্বর্গীয় কোনো জিনিস। বাবার তো উচিৎ প্যাকেট খুলে ওদের সবাইকে একটি করে সিগারেট দেয়া। কিন্তু বাবা দিচ্ছেন না। বাবা আরেকটা সিগারেট একই কায়দায় ধরালেন একই কায়দায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং আরো কিছু লোক একই ভাবে সেটার ওপর হামলে পড়ল। আমার কেনো জানি মনে হলো বাবা দৃশ্যটা খুব উপভোগ করছেন। কী জানি! আমার ভুলও হতে পারে। এই রকম দৃশ্যে তাঁর মজা পাবার কথা না। কিন্তু—‘মানুষ বড়ই বিচিত্র। একজন মানুষের ভেতরে অনেকগুলো মানুষ বাস করে। একেক ঘটনায় একেকটা মানুষ প্রকাশিত হয়।’ আমি কি তবে বাবার ভেতরকার কোনো একজন মানুষকে একটু আগে দেখে ফেললাম!

বাবাকে পেয়ে গ্রামটা যেনো উৎসবে মেতে উঠল। সেই উৎসবে আমি হচ্ছি বাড়তি বোনাস। লোকজন যা ইচ্ছে জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞেস করা উচিৎ নয় এমন প্রশ্নও করে অবলীলায়। সবচে আশ্চর্যের ব্যাপারটা হচ্ছে এখানে কেউই অন্য কারো প্রাইভেসি বিষয়ে সচেতন না। ব্যাক্তিগত ব্যাপার বলে কোনো কিছুকে এঁরা আলাদা করে দেখতে শেখেননি।

আমার চাচা আর চাচী খুব আদর যত্ন করলেন। আমাদের কি খাওয়াবেন সেটা নিয়ে দুজনেরই পাগল পাগল অবস্থা। বাবা যতোই বলছেন ‘ব্যস্ত হইও না’ ওঁরা ততোই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। চিনির প্রলেপ দেয়া অদ্ভুত এক ধরণের মিষ্টি আমাকে খেতে দিলেন তাঁরা। এটার নাম নাকি জাম। নাম জাম হলেও দেখতে এটা জামের মতো নয়। জাম তো কালো হয়। জাম মানে তো কালোজাম। কিন্তু এইটার রঙ শাদা এবং পিংকের মাঝামাঝি। সাইজটা কালোজামের চাইতে সামান্য ছোট। প্রতিটা পিংকশাদা জামকে চিনির ওপর গড়িয়ে দিয়ে তার পুরো শরীরে চিনির বেশ মোটা একটা প্রলেপ লাগান হয়েছে। মিষ্টির ওপরের অংশটা তাই বেশ শক্ত। কিন্তু কামড় বসালে ভেতরের নরম মিষ্টিটা আবিস্কৃত হয়। ভয়াবহ রকমের সুস্বাদু মিষ্টিটা। এমন মজার মিষ্টি আমি জীবনেও খাইনি। এমনিতেই মিষ্টি খেতে ভালোবাসি। এই স্পেশাল জামটা খেয়ে নিলাম টপাটপ অনেকগুলো। বাবার গ্রামে আমার প্রথম ভালোলাগা আইটেম এই জাম মিষ্টি।

বিকেলে বেরুলাম গ্রাম দেখতে। গ্রামটা সুন্দর। কিন্তু মানুষগুলো খুব গরিব। তাঁদের পরনের পোশাক ছেঁড়া কিংবা মলিন। বাচ্চা এবং কিশোরদের গায়ে জামা নেই বেশির ভাগ। এরা উদোম গা-য়ে থাকে। পায়ে স্যান্ডেল নেই একজনেরও। এখানে কিশোরীরাও শাড়ি পড়ে। সালোয়ার কামিজ পড়া কিশোরীর সংখ্যা হাতে গোণা। মহিলারা প্রায় প্রত্যেকেই মাথায় ঘোমটা দিয়ে রাখেন। বয়স্ক পুরুষরা বেশিরভাগই দাঁড়িঅলা। বৃদ্ধ আর বৃদ্ধারা রোগা-পটকা। পুরো গ্রামে মোটা মানুষ প্রায় নেই বললেই চলে। কঠিন শারীরিক পরিশ্রম আর খাদ্য-স্বভাবের গুণেই গ্রামে মোটা হবার সম্ভাবনা কম থাকে। সুঠাম দেহের মানুষ আছেন অনেক, কিন্তু জীর্ণ শীর্ণ মানুষের সংখ্যাই বেশি। আমার খুবই মন খারাপ হলো। বাড়িঘরগুলোতেও দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। বর্ণহীন ঘোলাটে টিনের চালের নিচে কেমন হলদেধুসর রঙের বেড়ার ঘর। কিছু বাড়ি পাটখড়ি দিয়ে বানান। চকচক করছে কেবল আমাদের বাড়িটা। টিনশেড হলেও ঝকঝকে। বাড়ি দেখেই বোঝা যায় এটা ধনাঢ্য গৃহস্থের বাড়ি। গ্রামের পুব পাড়ার একমাত্র কুয়োটা আমাদের বাড়ির সীমানার ভেতরেই। গ্রামের মহিলারা এখান থেকেই পানি নেয় কলস ভরে। গ্রামের একমাত্র মসজিদটাও আমাদের বাড়ির সীমানার ভেতরেই। গ্রামের লোকজন নামাজ পড়েন এই মসজিদেই।

গ্রামের ছেলেমেয়েদের আরবী পড়ানোর জন্যে একজন মুনশী আছেন। মুনশী থাকেন ছোট্ট একটা টং মতোন ঝুপড়ি ঘরে। ওটা আমাদের বাড়ির সীমানার ভেতরে পড়েনি। মুনশী একা মানুষ। তিনি অন্য গ্রামের লোক। কিন্তু থাকেন এই গ্রামে। ছেলেমেয়েদের আরবী পড়ানোর বিনিময়ে তিনবেলা খাওয়া আর বছর শেষে একবার নতুন লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-জায়নামাজ-টুপি এবং তসবিহ কিনে দেয়া হয় মুনশীকে। মুনশীর খাওয়ার সিস্টেমটা দারূণ! মাসের তিরিশ দিন ঘুরেফিরে পাঁচ-ছটা বাড়িতে তিনি খাওয়া-দাওয়া করেন। কোন বাড়িতে কবে খাবেন সেটা পূর্ব নির্ধারিত। ব্যাবস্থাটা আমার কাছে খুবই চমৎকার লাগলো! মুনশী বেশ সুখেই আছেন। প্রায় প্রতিদিনই তিনি কোনো না কোনো বাড়ির অতিথি! বেড়াতে যাবার মতো করে তিনি বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে ভালো-মন্দ খেয়ে আসেন। এমনিতে মুনশী গরিব মানুষ। কিন্তু গ্রামের লোকজনের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় লোকটা টইটম্বুর। গৃহবধুরা মুনশীর জন্যে খুব আন্তরিকতা আর মমতা দিয়ে রান্না করেন। এই মানুষটার কল্যাণেই তাঁদের ছেলেমেয়েরা আরবী পড়তে শিখছে। লোকটাকে খাওয়ালেও সওয়াব। মুনশীর সঙ্গে পরিচয়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই খুব নিচু কণ্ঠে আমার কাছে জানতে চাইলেন মুনশী—বাজান আপনে কি আরবী পড়তে পারেন?

আমাকে আপনি করে না বলতে অনুরোধ করে তাঁকে বললাম—জ্বী না। আমি আরবী পড়তে পারি না।

–কুনু অক্ষরও চিনেন না মানে চিনো না? এই যেমন আলিফ বে তে ছে জিম?

–জ্বী না।

–তাইলে আমার কাছে আইসো আমি শিখাইয়া দিমু।

–জ্বী আসবো।

–শোনো বাজান খোদার দুনিয়ায় খালি বাংলা ইংরাজি শিখলে হইবো না। শেষ বিচারের দিন কেয়ামতের ময়দানে আল্লায় তোমারে আরবীতে প্রশ্ন করলে জবাব দিতে হইবো না? আরবী না শিখলে জবাব দিবা ক্যামনে?

আমি বললাম–আল্লাহ তো সব জানেন। আল্লাহ বাংলাও জানেন। আমি বাংলায় জবাব দিলেও আল্লাহ ঠিকই বুঝবেন।

আমার যুক্তিতে হেরে গিয়ে চমৎকার একটা হাসিতে পরাজয় মেনে নিলেন মুনশী—ঠিকই কইছো তো বাজান! আল্লায় পৃথিবীর সব ভাষা বুঝেন। পশু-পাখিদের ভাষাও বুঝেন। তিনি পোকা মাকড়ের ভাষাও বুঝেন। তোমার তো দারূণ বুদ্ধি! তারপরেও শিখলে তো অসুবিধা নাই। আমি তোমারে আরবী হরফ শিখাইতে চাই। তোমার মাথা যেমুন সরস দুইদিনেই তুমি সব হরফ চিন্না ফালাইবা।

আমি বললাম—শিখবো। আপনার কাছে আমি আরবী শিখবো স্যার।

–আমারে স্যার কইওনা। স্যার হইলো ইশকুলে যারা পড়ায় হ্যারা। আমি হুজুর। আমারে হুজুর বইলা ডাইকো।

আমি বললাম—জ্বি হুজুর।

সেবারই প্রথম প্রথম আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে শাপলা আর শালুক দেখলাম। আমার বন্ধু হয়ে ওঠা এক কিশোর আমাকে বলেছিলো —জানো, এই শাপলা আর শালুক খাইয়া গ্রামের কতো গরিব মানুষ বাঁইচা থাকে!

আমি তো অবাক!—বলো কি! শাপলা আর শালুক লোকে খায়ও নাকি!

–খায়। শাপলা দিয়া তরকারি রাইন্ধা খায় আর শালুক খায় সিদ্ধ কইরা নাইলে আগুনে পোড়াইয়া।

আমাকে মন খারাপ করতে দেখে গ্রামের সরল সেই বন্ধুটা বলেছিলো—মন খারাপ কইরো না। দ্যাশের বেশিরভাগ মানুষই তো গরিব। গ্রামের মানুষরা আরো বেশি গরিব। গ্রামে গরিবরা ভাত যোগাড় করতে পারে না বইল্লা বাড়ি বাড়ি ঘুইরা ভাতের ফ্যান চায়। সেইটাও সব সময় দেয় না গৃহস্থরা। গরুতে খায় ফ্যান। দিয়া দিলে গরু কি খাইবো? ভাতের ফ্যান মানি মাড়। তোমরা যেইটারে বলো মাড় গ্রামে সেইটাই ফ্যান।

–ভাতের ফ্যান কিভাবে খায়?

–ফ্যানের মইধ্যে লবণ দিয়া কাঁচা মরিচ দিয়া খায়। এইটা ধরো অনেকটা ডাইলের লাহান। ভাতের ফ্যানে অনেক শক্তি থাকে। সেই কারণে এইটা খাইলেও বাঁচন যায়। তাছাড়া ভাতের ফ্যান তো তাই ফ্যানের মইধ্যে ভাতের গন্ধ থাকে। এই ভাতের গন্ধটা উপাসী মানুষগো আত্মারে শান্তি দেয়। উপাসী মানুষটা ভাত খাওনের তৃপ্তি পায় মনে মনে। এইডা মনে করো য্যান নিজেরে নিজে একটা বুঝ দিলো। নিজের লগে নিজের একটা প্রতারনাও কইতে পারো। খাইলাম ফ্যান কিন্তু গন্ধটা তো ভাতের!

আহারে!ভাতের গন্ধ! ভাতের গন্ধ জিনিসটাকে আলাদা করে কখনো ভাবিনি তো! মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে কতো কষ্টই না করে! ভাত না পেয়ে ভাতের ফ্যান খায়। সেটাও পায় না!

গ্রামটায় প্রচুর হাঁস। প্যাঁক প্যাঁক করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে হাঁসগুলো ছুটোছুটি করছে। ওদের পেছনে গ্রামের কয়েকটা দুষ্টু ছেল। ছেলেগুলো খামোখাই ধাওয়া করছে হাঁসগুলোকে। প্রায় প্রতিটা বাড়ির উঠোনেই বেশ উঁচু উঁচু খড়ের গাদা। রান্না ঘরের পাশে পাটখড়ির স্তুপ। রান্নাঘরের চুলোগুলো সব মাটির তৈরি। এরকম মাটির চুলোয় পাটখড়ি আর গাছের শুকনো ডালের লাকড়িতে আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা হয়। প্রচুর ধোঁয়া তাই রান্নাঘরকে ঘিরে। গৃহস্ত বাড়িতে গরু থাকবেই। যে গৃহস্ত যতো বেশি ধনী তার ততো বেশি গরু। গরুদের থাকবার জন্যে বানান হয় গোয়াল ঘর। কোনো কোনো বাড়িতে আলাদা গোয়াল ঘর নেই। রান্নাঘর লাগোয়া খালি জায়গায় গরুগুলোকে বেঁধে রাখা হয়েছে। মাটির তৈরি বিরাট বড় কালো গামলায় ভাতের ফ্যান কিংবা পানি তুলে রাখা। গামলার পাশে শুকনো খড় এবং ঘাসের স্তুপ। এগুলো গরুর খাবার। কিছুক্ষণ পর পর অকারণেই ডেকে ওঠে গরু—হাম্বাআআআ। ছাগলের সংখ্যাও বিপুল। গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি হচ্ছে গ্রামের মানুষদের কাছে মূল্যবান সম্পদ। ছাগলের বাচ্চাগুলো এতো কিউট! দেখলেই কোলে নিয়ে আদর করতে ইচ্ছে করে।

গ্রামে এসে নতুন একটা শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলাম আর সেটা হচ্ছে আড়ং। আড়ং হচ্ছে প্রতিদিনের সকালের বাজার। মাছ মাংস শাকসব্জি তেল ডাল নুন সব পাওয়া যায় আড়ং-এ। রোজ বসে যেই বাজার সেটা আড়ং। আর প্রতি সপ্তাহে বড় একটা বাজার বসে বাঞ্ছারামপুরে। সেটা হচ্ছে হাট। আশপাশের দশগ্রামের মানুষ জড়ো হয় হাটে। ধনাঢ্য বেপারীদের বিপুল পসরায় গমগম করতে থাকে জমজমাট হাটটি। হেন জিনিস নেই যা বিক্রি হয় না হাটে।

কোনো আনন্দই দীর্ঘস্থায়ী নয়। আমার সকল আনন্দ ম্লান করে দিয়ে মুসলমানীর দিন ঘনিয়ে আসছিলো। আমি প্রতিদিন রাতে ঘুমুতে যাবার আগে প্রার্থনা করতাম–হে আল্লাহ আমাকে তুমি মেয়ে বানিয়ে দাও। আমি মেয়ে হয়ে জন্মালে কী এমন ক্ষতি হতো এই পৃথিবীর? আমাকে তুমি মেয়ে বানিয়ে দাও আল্লাহ। শুনেছি তোমার কুদরতের কোনো শেষ নাই। ঘুম থেকে জেগে উঠে আমি যেনো মেয়ে হয়ে যাই।

প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে আমি বুঝতে পারতাম আমার প্রার্থনা কবুল হয়নি। খামোখাই একটা ছেলে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি আমি নিষ্ঠুর এই দুনিয়ায়!

মাঝেমধ্যেই মনে হতো–আচ্ছা আমি কোনো হিন্দু পরিবারে জন্মালে কী এমন ক্ষতি হতো এই পৃথিবীর! একটা মুসলমান কম হলে কী এমন আসতো যেতো!

গ্রামে আমার বেশ কিছু সমবয়েসী বন্ধুর একজনের নাম ছিলো কাইক্কা। কাকিলা মাছকে গ্রামে কাইক্কা বলতো সবাই। ছেলেটার মুখের আকৃতির সঙ্গে কাকিলা মানে কাইক্কার সাদৃশ্য আবিষ্কার করে কোনো বদমাশ কিশোর ওকে কাইক্কা উপাধি দিয়েছে। এবং জনগণ বিপুল ভাবে সেই উপাধিকে সমর্থন দিয়েছে। আর সে কারণেই ছেলেটার প্রকৃত নামটা ঢাকা পড়ে গেছে এই কাইক্কা নামের আড়ালে। এক দুপুরে কাইক্কা আমাকে জানালো সে পয়গম্বর হয়ে গেছে।

মানে?

মানে সকালে ঘুম থেকে জেগে সে দেখে যে রাতে অটোমেটিক ঘুমের ঘোরেই তার মুসলমানী হয়ে গেছে। গ্রামে নাকি এটাকে বলে পয়গম্বর হওয়া। এরপর আমার প্রার্থনার ভাষা গেলো পাল্টে–হে আল্লাহ্‌ আমাকে তুমি পয়গম্বর বানিয়ে দাও…।

কিন্তু আমার এই প্রার্থনাটাও মঞ্জুর হয়নি।

এক সকালে থুতনিতে ছাগলদাঁড়ি সমৃদ্ধ হাজাম এসে উপস্থিত হলেন আমাদের উঠোনে। খুঁটা ছেঁড়া গরুর মতো আমি তো দিলাম একটা দৌড়। দূরের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ থেকে আমাকে ধরে আনা হলো। অনেকটা নীলডাউন টাইপের অদ্ভুৎ একটা ভঙ্গিতে আমাকে বসিয়ে আমার দুই হাতকে হাঁটুর তলা দিয়ে বিশেষ কায়দায় পেঁচিয়ে এমন ভাবে আমাকে ধরে রাখলো দুজন যে আমার একেবারেই যাকে বলে নট নড়ন চড়ন অবস্থা! গ্রামের মানুষেরা প্রাইভেসীর ধার ধারেনা। সুতরাং একটা অসহায় বালকের ইয়ে কর্তন পরিদর্শনের নিমিত্তে উঠোনভর্তি উৎসাহী জনতা হামলে পড়লো দরোজার সামনে। আমার ভয়ার্ত আর বিষ্ফারিত চোখের সামনে হাজাম ব্যাটা তার ছোট্ট বাকশোটা খুলে সেখান থেকে কোনো খুর-কাঁচি বের না করে খুবই পাতলা একটা সবুজ রঙের ডাল টাইপের কি একটা বের করলেন। খুব গৌরবের সঙ্গে ঘোষণা করলেন–এইটা হইতাছে ধার দেওয়া দাও দিয়া সবুজ বাঁশ থেইকা চাঁইছা বাইর করা ছাল দিয়া বানানি অস্ত্র। খুর-কাঁচির থেইকাও এইটার ধার বেশি। কুট্টুস কইরা কাইট্টা ফালাইবো টের পাওনের আগেই। কুনু ব্যথা পাইবা না। আরে! আসমানে অইডা কি? বলে লোকটা আকাশের দিকে আমার দৃষ্টি ফেরাতে চায়। কিন্তু আমি তার এইসব জাড়িজুড়ি বিশ্বাস না করে তাকিয়ে আছি তার সেই বিশেষ আর্মসের দিকে! আর চিৎকার করছি গগনবিদারী–আমি মুসলমানী করবো না…

হাজামের ইশারায় আমার দুইপাশে থাকা আমাকে ঠেসে ধরে রাখা দুই ষণ্ডামার্কার একজন একহাতে আমার চোখ ঢেকে ফেললো এবং সেকেণ্ডেরও কম সময়ে আমার সর্বনাশ যা ঘটার তা ঘটে গেলো। খুব সামান্য পিঁপড়ার কামড়ের মতো একটু ব্যথা পেলেও আমি এমন চিৎকার দিলাম যে মনে হলো আমার কাহিনি খতম! এখন শুধু ইন্নালিল্লাহিটা পড়া বাকি! হাজাম লোকটা অপূর্ব দক্ষতায় আগে থেকেই জ্বালিয়ে রাখা কুপির আগুনে ইঞ্চিদেড়েক ব্যাসার্ধের কয়েকপ্রস্তে মোড়ানো একটা কাপড়ের টুকরোকে পুড়িয়ে ছাই টাইপের ব্যান্ডেজ বানিয়ে সেটা দিয়ে মুড়িয়ে দিলেন ক্ষতস্থান। ব্যস। আর কোনো অষুধপত্রের বালাই নেই।

খানিকটা ঝলসে যাওয়া চিনচিনে একটা জ্বলুনি ধরণের ব্যথা আর বুক ভরা অভিমান নিয়ে অশ্রুসজল আমি শুয়ে থাকলাম নতুন কেনা একটা ছোটদের লুঙ্গি পরে। দু'পাশের দুই হাঁটুকে উঁচু বালিশের সাপোর্ট দিয়ে মোহনীয় ভঙ্গিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে আমাকে।

আমার তথাকথিত নিষ্ঠুরস্বজনরা তখন মিষ্টি খাওয়ার মচ্ছবে মেতে উঠেছে!

হায় রে অসহায় কিশোর…..

বালকের দুঃখ বোঝে না এই ধরিত্রি…

রচনাকাল/

অটোয়া ২৩ জুলাই ২০১৬

লুৎফর রহমান রিটন

লেখক পরিচিতি

লুৎফর রহমান রিটন

← পূর্ববর্তী

আমার অরণ্যে আমি

পরবর্তী →

ক্যাঙ্গারুর দেশে